অতিমাত্রায় প্যারাসিটামল সেবন ঝুঁকিপূর্ণ

[আমাদের দেশে ফার্মেসিগুলো থেকে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অনেক ওষুধ কেনা যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় প্যারাসিটামল বা এই গ্রুপের অন্য ওষুধ। শিশু কিংবা বড়দের জ্বর, মাথাব্যথা, গা-ব্যথা এসবের জন্য প্রথম পর্যায়ে কেউই ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। নিজেরাই প্যারাসিটামল বা এই গ্রুপের অন্য নামের ওষুধ ফার্মেসি থেকে কিনে ডোজ শুরু করে। তবে, না জেনে ভুল মাত্রায় কিংবা অতিমাত্রায় এ ওষুধ খেলে নানা জটিলতা তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা আরো বেশি। এসব বিষয়ে জানাচ্ছেন শিশু বিশেষজ্ঞ কামরুন নাহার লুনা।]

শিশু বিশেষজ্ঞ কামরুন নাহার লুনা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার প্র্যাকটিস চলাকালীন সময়ের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। স্মৃতির পাতা থেকে তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর আগের কথা। সকালে স্যারের(সিনিয়র ডাক্তার) রাউন্ডের আগে পুরনো রোগীগুলো দেখে নিচ্ছিলাম। এ সময় স্যার ডেকে পাঠালেন। দৌড়ে গেলাম স্যারের রুমে। দেখি একটা মেডিকেল স্টুডেন্ট কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়ানো আর তার মা একটা বাচ্চা কোলে চেয়ারে বসা। সে তার ৬ মাস বয়সি ৮ কেজি ওজনের বাচ্চাটাকে ৩ চামচ প্যারাসিটামল ড্রপ খাইয়েছে গত ২০ ঘন্টায়। স্যার মেয়েটাকে মৃদু বকার চেষ্টা করছেন। আমার প্রফেসর খুব নরম মনের মানুষ, কাউকে তেমন বকতে পারেন না। আমি যদিও তখন তার নব্য ট্রেইনি, খুব আদর করেন আমাকে, ভরসাও করেন আমার উপর। বললেন লুনা দেখতো এই মেয়ের কাণ্ড প্যারাসিটামল ড্রপকে চামচে করে খাইয়েছে। ডোজটা হিসাব করো, টক্সিক ডোজে পড়লে এন্টিডটটা শুরু করে দাও।

হিসাবটা করলাম এভাবে-

১ চামচ(৫ মিলি) প্যারাসিটামল সিরাপে থাকে ১২০ মিলিগ্রাম। আর প্যারাসিটামল ড্রপে ১ মিলিতে থাকে ৮০ মিলিগ্রাম, মানে ৫ মিলি বা ১ চামচ ড্রপে ৪০০ মিলিগ্রাম। তাহলে ১ চামচ সিরাপ খেলে সে পেল ১২০ মি.গ্রা। কিন্তু ১ চামচ প্যরাসিটামল ড্রপে সে খেয়ে ফেলল ৪০০ মিলি গ্রাম। এই বাচ্চাটা বিগত ২০ ঘণ্টায় ৩ চামচ ড্রপ মানে প্রায় ১২০০ মিলিগ্রাম খেয়ে ফেলেছে।

প্যরাসিটামলের ডোজ ১৫ মিলিগ্রাম/কেজি। মানে যে বাচ্চার ওজন ৮ কেজি সে ১২০ মি.গ্রা মানে এক চামচ সিরাপ খেতে পারবে। আর টক্সিক ডোজ হল ১৫০ মিগ্রা/কেজি মানে নরমাল ডোজের ১০ গুণ। বাচ্চাটা টক্সিক ডোজেই খেয়েছে।

ওষুধের বিষক্রিয়া কাটানোর জন্য যে ওষুধ দেওয়া হয় তাকে এন্টিডট বলে। প্যারাসিটামলের এন্টিডট NAC(n acetyl cystin) তখনো চট্টগ্রামে সবসময় পাওয়া যেতো না। oral NAC টা তখনো বাজারেই আসেনি। ইঞ্জেকটেবল NAC টা মাঝে মাঝে হাজারী গলিতে পাওয়া যায়। তবে দাম বেশি। তারা কয়েক এম্পুল নিয়ে আসল। ইনফিউসনে দিতে হয়। প্যরাসিটামল ওভার ডোজে ১২ ঘন্টার মধ্যে দিতে হয়। বাচ্চাটার ১২ ঘন্টা পার হয়নি। ভালোয় ভালোয় বিপদ কেটে গেল।

আরো কিছু অভিজ্ঞতা- আরেকবার আমার এক বন্ধুর বাচ্চা (সে নিজেও এখন বড় শিশু বিশেষজ্ঞ) ১০টা প্যরাসিটামল ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছিল। তাকে এক ক্লিনিকে ভরতি করিয়ে NAC infusion দেওয়া হয়।

অন্য বার এক বাচ্চা পেয়েছিলাম যে প্যারাসিটামল সিরাপ এক বোতল পুরা নিজে নিজে বোতলে মুখ দিয়ে খেয়ে ফেলেছিল। তার জন্য ঢাকা থেকে NAC আনাতে হয়েছিল কারণ সেবার চট্টগ্রামে ওষুধ পাইনি।

বাচ্চাকে প্যারাসিটামল খাওয়ানোর সময় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন

১. প্যরাসিটামল একটি over the counter drug মানে বিনা প্রেসক্রিপশনে পাওয়া যায়। নরমাল ডোজে কোন অসুবিধা নেই কিন্তু ওভার ডোজে মারাত্মক ক্ষতিকর, লিভার নেক্রোসিস করে ফেলে এবং সহজেই ওভরডোজ হতে পারে।

বাচ্চাকে ড্রপ বা সিরাপ খাওয়ানোর আগে ভলোকরে ডোজ জেনে নিন।

২. বাচ্চার প্রতি কেজি ওজনের বিপরীতে ১৫ মিলিগ্রাম করে দিনে ৪ বার দিতে পারবেন। তবে একবার দিলে ৪ ঘন্টার মধ্যে আর দেওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে জ্বর না পড়লে, কুসুম গরম পানি দিয়ে গা মুছে দিন।

৩. প্যরাসিটামল ড্রপকে কোনো অবস্থাতেই চামচে করে খাওয়ানো যাবে না। ড্রপার দিয়েই খাওয়াতে হবে।

৪. একটা সাপোসিটরিতে ১২৫ মিলিগ্রাম থাকে। এক চামচ সিরাপের বদলে একটা ১২৫ সাপোসিটরি দেওয়া যাবে। যে রুটেই দেন না কেন ৪ বারের বেশি দেওয়া যাবে না।

৫. জ্বরের জন্য প্যরাসিটামলের সাপোসিটরির বদলে ক্লোফেনাক সাপোসিটরি কোন অবস্থাতেই দেওয়া যাবে না। এটা মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে অতিরিক্ত হাইপোথারমিয়া বা রক্তক্ষরণ হতে পারে। আর ডেঙ্গুজ্বর যদি হয় ক্লোফেনাকের পরিণাম মারাত্মক হতে পারে।

৬. প্যারাসিটামল ওভারডোজ হলে সাথে সাথে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। কারণ ১২ ঘন্টা পার হয়ে গেলে এন্টিডট ভালো কাজ করবে না।

৭. কারো কারো ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল এর লিভার ডেমেজ এর রিস্ক বেশি। যদি কারো পুষ্টিহীনতা থাকে, ভাইরাল ডিজিজ হিস্ট্রি থাকে, phynitoin বা phenobarbiton অর্থাৎ খিচুনি রোগের ওষুধ খায়। তাহলে তাদের ক্ষেত্রে আরো কম প্যারাসিটালেই ওভারডোজ হবে।

বড়দের ক্ষেত্রে

  • বড়দের ক্ষেত্রে আগে US-FDA(2009) বর্তমানে রিকমেন্ডেট ডোজ কমিয়ে ১০০০ মিলিগ্রামের বদলে ৬৫০ মিলগ্রাম সিংগেল ডোজ আর টোটাল ডেইলি ডোজ ৪ গ্রামের বদলে ২৬০০ মিলিগ্রাম করেছে।
  • সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল ওভারডোজের প্রথম ২৪ ঘন্টা কোন উপসর্গই থাকে না অথবা সামান্য বমিভাব, প্রচুর ঘাম হওয়া। পেটের ডানপাশ্ সামান্য ব্যথা থাকতে পারে। কিন্তু এন্টিডট শুরু করতে হয় ১২ ঘন্টার মধ্যেই। তাই ডোজের হিসেব না জানলে বা ডাক্তরের পরামর্শ না মানলে ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেলে এন্টিডট কাজ করবে না যা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
ডা. কামরুন নাহার লুনা : লেখক

পথে প্রবাসে/সামিয়া ইসলাম।

You might also like

Leave a Reply

শিরোনাম